আজ, Saturday


৩০শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
শিরোনাম

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হোক

সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হোক
সংবাদটি শেয়ার করুন....

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সন্ত্রাস, গণপিটুনির ঘটনা, অপহরণ, মাদক ব্যবসা ও নানা ধরনের অপরাধ নিয়মিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে, যার প্রভাব দৃশ্যমান হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দিন দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এসব পরিস্থিতি আইনের শাসনের অভাবকেই নির্দেশ করছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা এ অবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো চরম অবনতি ঘটতে পারে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সম্প্রতি রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে একজন ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে ও পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়েছে। ভিডিওতে ধারণ করা সেই নৃশংস দৃশ্য দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সারা দেশে সহিংসতা, খুন ও অপরাধের ধারাবাহিকতার অংশ। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৯৩০ জন। মাসভিত্তিক খুনের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। জানুয়ারিতে ২৯৪ থেকে জুনে এসে তা পৌঁছেছে ৩৪৩-এ। গড়ে প্রতিদিন খুন হচ্ছে ১১ জন। একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে ৩৬৬টি ডাকাতি, অপহরণ ৫১৫ এবং ১১ হাজার ৮ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে একটি বিষয়ই নির্দেশ করছে—দেশে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। খুনের বহু ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, চাঁদাবাজি এবং দলীয় কোন্দল। যেমন ঝিনাইদহে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দুই ভাই নিহত হয়েছেন। খুলনায় যুবদলের সাবেক সহসভাপতিকে হত্যা করা হয়েছে। একটি গুরুতর বাস্তবতা হলো অনেক অপরাধ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংঘটিত হচ্ছে। দলীয় কোন্দল, ক্ষমতা দখল, চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনায় মানুষের প্রাণ ঝরছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়, তখন আইনের সঠিক প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশে আগে সংঘটিত খুনসহ বহু অপরাধের বিচার বিলম্বিত হয়েছে, এমনকি অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে পার পেয়ে যায়। এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি এক ভয়াবহ বার্তা দেয়—অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। এটি নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে ও সমাজে আইনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যখনই কোনো ঘটনা ঘটে তখনই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো বিভিন্ন ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতমূলক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলে পুলিশের কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঢিলেমির চিত্র জনমানুষের চোখে পরিষ্কার। বর্তমান আইন-শৃঙ্খলার অবনতি কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামাজিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। একদিকে অপরাধীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিত্যনতুন অপরাধ সংঘটিত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও কলেজে যাওয়ার পথে শঙ্কিত, ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর সাধারণ নাগরিকরা নিজ নিজ বাসাবাড়িতেও নিরাপদ বোধ করছেন না। অপরাধীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তারা দিনদুপুরে প্রকাশ্যে খুনসহ নানা অপরাধ ঘটাতেও দ্বিধা করছে না। এ অবস্থায় পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তবে জনসাধারণের মধ্যে সরকার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি চরম হুমকির মুখে পড়বে। দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে পড়বে। এটি কেবল সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা যদি অপরাধীদের হাতে বিঘ্নিত হয়, তবে তা গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেবল বাহিনীর তৎপরতা নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হবে মূল পরিচয়। নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস ও অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ায়। সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। অপরাধ কমানো বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শুধু পুলিশের একক দায়িত্ব নয়—এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। রাজনৈতিক স্বার্থে অপরাধীদের প্রশ্রয়, বিচারহীনতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা যদি চলতেই থাকে তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটি নৈরাজ্যের নাম হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কাউকে ছাড় নয়, অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। আজ যখন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীন, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধী ধরাই নয়—একটি ভয়মুক্ত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নিশ্চিত করা।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:১৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

দৈনিক গণবার্তা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সম্পাদকঃ শাহিন হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ মোঃ শাহ পরান হাওলাদার

বিপিএল ভবন (৩য় তলা ) ৮৯, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা ।

মোবাইল : ০১৭১৫১১২৯৫৬ ।

ফোন: ০২-২২৪৪০০১৭৪ ।

ই-মেইল: ganobartabd@gmail.com