

স্টাফ রিপোর্টার: যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির গতি আগের তুলনায় কমেছে। তবে নিত্যপণ্যের দাম এখনো তেমন কমেনি। বিশেষ করে মুদি পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বেড়ে যাওয়ার পর তা আর আগের অবস্থায় ফিরছে না। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘রকেটস অ্যান্ড ফেদারস ইফেক্ট’। অর্থাৎ দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু কমে খুব ধীরে। খবর জাপান টুডে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কভিড-১৯ মহামারীর পর খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এরপর মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করলেও সে দাম আর তেমন কমেনি। ফলে ভোক্তারা এখনো উচ্চমূল্যের চাপ বহন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলার পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মূল্যচাপও হয়েছে দীর্ঘায়িত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ২০২৬ সালের মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। জুনে তা কমে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে আসে।পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনারসের বৈশ্বিক গ্রোসারি বিভাগের প্রধান ম্যাট হ্যামোরি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে পণ্যের দাম কমছে না। বিষয়টা এখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমা আর মূল্যহ্রাস এক বিষয় নয়। দাম কমতে হলে মূল্যহ্রাস বা ডিফ্লেশন প্রয়োজন, যা খুবই বিরল। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটির বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৪-২৫ সালের তুলনায় এ হার কিছুটা বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মহামারীর পর যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বাজারে রয়ে গেছে। এ কারণে ক্রেতাদের ব্যয়ের ধরনও বদলে যাচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানি ও বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেনআইকিউর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মুদি দোকানগুলোয় কেনাকাটার পরিমাণ কমেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা আরো কমেছে প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ওজন কমানোর জিএলপি-১ ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় মুদি পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন কম দামের পণ্য খুঁজে বিভিন্ন দোকানে ঘুরছেন। ফলে ডিসকাউন্ট-ভিত্তিক খুচরা বিক্রেতারা বাজারে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউমেরেটরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) কস্টকো, ওয়ালমার্ট ও অ্যালডির মতো ডিসকাউন্টভিত্তিক খুচরা বিক্রেতারা বাজারের হিস্যা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ক্রোগার ও অ্যালবার্টসন্সের মতো প্রচলিত সুপারমার্কেটগুলোর বাজার হিস্যা কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দাম দ্রুত বাড়লেও তা সহজে কমে না। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসির জ্যেষ্ঠ নীতি গবেষক জ্যারেড বার্নস্টেইন বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতারা সাধারণত বেশি দামে কেনা পণ্যের মজুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাম কমাতে চান না। এছাড়া খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মহামারীর পর যে অতিরিক্ত মুনাফা পেয়েছে, তা ধরে রাখতে চায়। ফলে তারা দ্রুত দাম কমানোর পথে হাঁটে না।’
এর উদাহরণ হিসেবে পেপসিকোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। কাঁচামাল ও প্যাকেজিং ব্যয়ের নামে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২-২৩ সালে টানা আট প্রান্তিক পণ্যের দাম বাড়ায়। পরে বিক্রি কমে গেলে গত বছর কিছু পণ্যের দাম কমাতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।ক্রেতাদের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দাম বেড়ে গেলে মানুষ বিকল্প দোকান খোঁজে। কিন্তু দাম কিছুটা কমতে শুরু করলে অনেকেই আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যায়। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ কমে যায়।সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না। কিছু পণ্যের দাম দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণে বাড়ছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।এর মধ্যে কফি অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় বিভিন্ন শহরের কফির গড় দাম ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের খরা, ইন্দোনেশিয়ায় অতিবৃষ্টি ও ব্রাজিলের অতিরিক্ত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে কফির উৎপাদন কমেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে সরকারি নীতিও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে, মেক্সিকো থেকে আমদানি করা টাটকা টমেটোর ওপর ১৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করায় চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে টাটকা টমেটোর দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাজারে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় খুচরা বিক্রেতারা মূল্যছাড় বাড়ালে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হাঁটতে বাধ্য হবে। চলতি মাসের শুরুতে ওয়ালমার্ট জানায়, গরুর কিমা, ভুট্টা, লাল চেরি, আইসক্রিম, আলুর চিপস এবং কোকা-কোলা ও পেপসির কিছু পণ্যের দাম কমেছে। এর আগে মার্চে টার্গেটও কিছু খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গ্রাহক ধরে রাখতে মূল্য কমানোর কৌশলে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে পুরো বাজারেই প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে ধীরে ধীরে নিত্যপণ্যের দামেও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে সে পরিবর্তন রাতারাতি হবে না।

Posted ৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
দৈনিক গণবার্তা | Gano Barta


