স্টাফ রিপোর্টার :
বিলম্বিত সিদ্ধান্ত খাদের কিনারে থাকা দেশের গ্যাস সেক্টরকে চরম সংকটে ফেলে দিতে পারে। সরকারের হাতে থাকা সীমিত বিকল্পগুলোর বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
মজুদ কমে আসায় প্রতিদিনেই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। এক সময় দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হলেও এখন তা ১৯০০ মিলিয়নের নীচে নেমে এসেছে। এরমধ্যে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড থেকেই যোগান আসছে ৯৫০ মিলিয়নের মতো। সবচেয়ে শঙ্কার হচ্ছে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
প্রতিদিনেই কমছে ফিল্ডটির মুজদ। আর মাত্র ১ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে। ২০২৭ সালের দিকে গ্যাস ফিল্ডটির বড় ধরনের ধসের শঙ্কা করা হচ্ছে। খোদ পেট্রোবাংলা মনে করছে ২০২৭ সাল নাগাদ ৪০০ মিলিয়নের নিচে নেমে আসবে উৎপাদন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই ঘাটতি সামাল দেওয়ার জন্য জ্বালানি খনিজ সম্পদ বিভাগের হাতে কি বিকল্প রয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে খুব বেশি বিকল্প নেই। অল্প বিকল্পের মধ্যে রয়েছে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপ লাইন দ্রুত বাস্তবায়ন, এলএনজি টার্মিনালের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। পাশাপাশি দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কিছুটা গতি দেখা গেলেও পাইপলাইন ও এলএনজি টার্মিনালের বিষয়ে সন্তুষ্ঠ হতে পারছেন না অনেকেই। তারা বলেছেন, আগে থেকে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইনের বিষয়ে আলোচনা ছিল। সেই পাইপলাইনের রুট পরিবর্তন করে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল রুটের প্রাক-সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন চলছে বরিশাল-জাজিরা-আমিনবাজার পাইপলাইনের কনসালটেন্ট নিয়োগের কাজ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগী হওয়ার দরকার। বরিশাল-ঢাকা অংশের জন্য ওই অংশ ফেলে রাখা কোন যুক্তি হতে পারে না। ভোলা-বরিশাল রুটে অনেকগুলো নদী রয়েছে। যে কারণে ওই অংশের কাজ বেশি চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু বরিশাল-ঢাকা অংশে সেই চ্যালেঞ্জ নেই। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে ভোলা-বরিশালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, বরিশাল-জাজিরা-আমিনবাজার পাইপলাইনের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির দরপত্র মুল্যায়নের কাজ চলছে। মূল্যায়ন শেষে বোর্ডের মাধ্যমে অনুমোদন করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোলা-বরিশাল, বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন একসঙ্গে নাকি আলাদাভাবে করা হবে। সে বিষয়ে এখনও চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পৃথকভাবে বাস্তবায়ন, নাকি আলাদাভাবে করলে বেশি লাভ বিষয়টি ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
দ্বীপজেলা ভোলাতে ২টি গ্যাস ফিল্ড আবিস্কৃত হয়েছে। ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে, যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু চাহিদা না থাকায় মাত্র ৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট (২৯ এপ্রিল) উত্তোলন করা হয়েছে। আবার পাইপলাইন না থাকায় জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে না। বিগত সরকার সিএনজি আকারে ৫ মিলিয়ন আনার জন্য একটি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। কোম্পানিটি দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দিয়েছে গাজীপুর এলাকার কয়েকটি কারখানায়।
ভোলায় আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। পাইপলাইন বাস্তবায়ন ও প্রস্তাবিত কূপগুলো খনন শেষ করলে সেখান থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দ্রুত উদ্যোগ দরকার।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ভোলা থেকে দৈনিক ৮০ মিলিয়ন গ্যাস এলএনজি আকারে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা কথা নিশ্চিত করেন তিনি । তবে বিষয়টি কতটা অর্থনৈতিক হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
কেউ কেউ এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলার কথা বলেন। এলএনজির আকাশচুম্বি দাম যেমন বাধা, তেমনি চাইলেই ইচ্ছে মতো আমদানির পরিমাণ বাড়ানো সুযোগ নেই। দুটি এফএসআরইউ দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন আমদানি করা সম্ভব। নতুন এফএসআরইউ করতে গেলে দরপত্র চুড়ান্ত করার পর কমপক্ষে ১৮ মাস লাগবে। অর্থাৎ ২০২৬ সাল পর্যমন্ত এলএনজি আমদানি বাড়ানোর কোন পথ খোলা নেই, দামের ইস্যু বাদ দিলেও।
ভাসমান টার্মিনালের (এফএসআরইউ) পাশাপাশি প্রায় এক দশক ধরে আলোচিত হচ্ছে ল্যান্ডবেজড টার্মিনালের বিষয়ে। মহেশখালীতে স্থান নির্ধারণ করার পর ২০১৯ সালে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করা হয়। তাতে বলা হয়েছে কার্যাদেশ দেওয়ার পর ৮০ মাস সময় প্রয়োজন হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন এন্ড মাইন্স) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, পিপিপির মাধ্যমে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি চুড়ান্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলার পক্ষ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে বলে শুনেছি। তবে এখনও কাগজ পাইনি।
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কনসালটেন্ট ৮০ মাস বললেও চেষ্টা করলে কয়েক মাস আগেই শেষ করা সম্ভব। এখানে ল্যান্ড ডেভেলপ করতে সময় লাগবে ২ বছর। তারপর ৪ বছরের মধ্যে শেষ করা সম্ভব। এই প্রকল্পে আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো খরচ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
অর্থাৎ আজকে কাজ শুরু করলেও ২০৩১ সালের আগে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। সে কারণে ২০২৮ সাল নিয়ে মহাটেনশনে সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্টরা বুঝলেও মন্ত্রণালয়ের গতানুগতিক কাজ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
দেশীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধান কর্যক্রমে ৫০ কোটির বেশি ব্যয় প্রকল্পে তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি বাধ্যতামূলক রাখায় আটকা পড়েছে উৎপাদন কোম্পানিগুলো।
রাজধানী শহর ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী শিল্প এলাকায় এখনই গ্যাস সংকট জটিল আকার ধারণ করেছে। অদূর ভবিষ্যতে বিবিয়ানার উৎপাদন কমে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। সে কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পরিকলল্পনা পরিবর্তন করে বরিশাল-ঢাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। যা ছাড়া খুব কম বিকল্পই পেট্রোবাংলার হাতে রয়েছে।
বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে ১১৩ বছরে অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে ১০০টির মতো। এর মাধ্যমে ২৯টি গ্যাসফিল্ড আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি ৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারের একটি করে কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে, আমেরিকা প্রতি ১৪ বর্গকিলোমিটারের ১টি এবং ভারত ১৮.৬ বর্গকিলোমিটারের ১টি কূপ খনন মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়।
সঙ্গত কারণে দেশে গ্যাস সংকটের জন্য অনুসন্ধান স্থবিরতাকেই দায়ী করে আসছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
Posted ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫
দৈনিক গণবার্তা | Gano Barta