আজ, Wednesday


২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
শিরোনাম

ঝিকরগাছায় সরকারি পরিপত্র উপেক্ষা করে এতিম ছাত্রীকে বেত্রাঘাত

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঝিকরগাছায় সরকারি পরিপত্র উপেক্ষা করে এতিম ছাত্রীকে বেত্রাঘাত
সংবাদটি শেয়ার করুন....

আফজাল হোসেন চাঁদ : যশোরের ঝিকরগাছায় সরকারি নীতিমালা ও পরিপত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্যালয়ের এক ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে অমানবিক বেত্রাঘাত করার অভিযোগ উঠেছে এফ জে ইউ বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে। ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটিয়ে এতিম ওই ছাত্রীকে নির্যাতনের পর পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একটি প্রভাবশালী মহল গোপনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পৌর সদরের পুরন্দরপুর গ্রামের এক যুবকের সাথে গদখালী ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের আব্দুল মজিদের মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পর জীবিকার তাগিদে স্বামী প্রবাসে পাড়ি জমান এবং আনুমানিক ১০ বছর আগে প্রবাসেই হৃদরোগে আক্রান্ত বা অন্য কোনো কারণে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকেই নিহত প্রবাসীর স্ত্রী তাঁর দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে পিত্রালয়ে ভাইদের সংসারে আশ্রয় নেন এবং চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও নানা প্রতিকূলতার মাঝেও মেধাবী এতিম ছোট মেয়েটিকে চলতি বছরের শুরুতে অত্যন্ত আশা নিয়ে এফ জে ইউ বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু গত রবিবার ক্লা চলাকালীন অংক ভালো না পারার মতো তুচ্ছ অজুহাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইমদাদুল হক ওই এতিম ছাত্রীকে উপুর্যুপরি বেত্রাঘাত করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে শিশুটির কোমল মনে মারাত্মক আঘাত লাগে এবং সে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মামা ও এলাকার পরিচিত পশু চিকিৎসক টুটুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার এতিম ভাগ্নি অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের একটি মেয়ে। গত রবিবার (৩০ আগস্ট) গণিত ক্লাস চলাকালীন শিক্ষক ইমদাদ স্যার তাকে পড়া জিজ্ঞাসা করেন। ভাগ্নি ঠিকমতো উত্তর দিতে না পারায় এবং খাতায় দেওয়া অংকের মাত্র দুটি লাইন বাকি থাকায় কোনো কিছু বিবেচনা না করে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এরপর পরবর্তী ক্লাসের সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মেয়েটির মাথা ঘুরে সে ক্লাসের মধ্যেই পড়ে যায়। স্কুল শেষে বাড়িতে ফেরার পর সন্ধ্যার দিকে তার শারীরিক অস্বস্তি, জ্বরভাব ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে সে পরিবারকে সব খুলে বলে। পরে রাতেই তাকে দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এটি ওই শিক্ষকের জন্য কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে অকারণে মারধর করে স্কুল থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোনো অভিভাবক স্কুলটিতে গিয়ে এসবের প্রতিবাদ করতে চাইলে, তাদের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের আচরণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমরা অযথা কোনো শিক্ষকের সম্মানহানি চাই না, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”

এদিকে ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলে এফ জে ইউ বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইমদাদুল হক সত্যতা স্বীকার করে বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী ও বাধ্যগত করার উদ্দেশ্যে শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে একটু শাসন করে থাকেন। শ্রেণিকক্ষের টেবিলে রাখা লাঠিটি মূলত বোর্ডের লেখা পড়ানো দেখানোর জন্য রাখা হয়, তবে ওই দিন ভুলবশত একটু বেশি মাত্রায় ছাত্রীকে আঘাত করার বিষয়টি সত্য। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার পরিপত্র জারি করা থাকলেও উত্তেজনার বশে আমি ভুল করে ফেলেছি। পরে ছাত্রীটি অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পেয়ে আমি অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়েছি এবং শিক্ষার্থীর পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে এমন ভুল আর কখনো হবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।

বিদ্যালয়ের নবাগত সভাপতি ও সাবেক শিক্ষক আব্দুল হাই ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, শিক্ষকদের কাছে বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজ সন্তানের মতো। তাদের সঠিক মানুষ ও অনুশাসনে গড়ে তুলতে সামান্য শাসন বা তিরস্কার অতীতেও ছিল, যা এখনও প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তবে বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দেওয়া বা যেকোনো কঠোর শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নিলে শিক্ষার্থীরা অবাধ্য হয়ে উঠতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার অফিসে অনুপস্থিত থাকায় সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ সাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন বা বেত্রাঘাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি প্রচলিত সরকারি পরিপত্রের সরাসরি লঙ্ঘন। ঘটনার বিষয়ে আমি অভিযোগ পাওয়ার পর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে ফোনে বিস্তারিত কথা বলেছি। তিনি শিক্ষার্থীকে মারধর করার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি শিক্ষক হয়ে যা করেছেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং খুব দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৬:২৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৈনিক গণবার্তা – গণমানুষের আওয়াজ |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সম্পাদকঃ শাহিন হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ মোঃ শাহ পরান হাওলাদার

বিপিএল ভবন (৩য় তলা ) ৮৯, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা ।

মোবাইল : ০১৭১৫১১২৯৫৬ ।

ফোন: ০২-২২৪৪০০১৭৪ ।

ই-মেইল: ganobartabd@gmail.com