বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতি জোর দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, কমানোর জায়গার মধ্যে রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আর ভর্তুকি। এডিপিতে কমানোর জায়গা হচ্ছে প্রকল্প ব্যয়।
জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে বাজেট নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন তিনি।
জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে বাজেটে ঘাটতি কমাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার একটা ভিন্ন ধরনের সরকার। তাদের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নেই। এতদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার যে গতানুগতিকতার বাজেট দিয়ে আসছে, এই সরকারের কাছ থেকেও একই রকম বাজেট প্রত্যাশা করি না। নতুন বাজেট যেন সীমিত অভিলাষের হয়, সেই প্রত্যাশা করছি।’
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের জোগানের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে রাজস্ব। বিগত কোনো সরকারই ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। যদিও লক্ষ্য ছিল ৫-৬ লাখ কোটি টাকা। এখন সরকার যদি খুব চেষ্টাও করে, তার পরও ৫ লাখ কোটির বেশি আদায় করতে পারবে না। এতদিন বাজেট ঘাটতি ছিল আড়াই থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা। এখন মূল্যস্ফীতিকে যদি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হয়, তাহলে ঘাটতি কমাতে হবে।
ড. হোসেন বলেন,‘ঘাটতি পূরণে এক লাখ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ আনতে হবে। এটা সম্ভব। তবে বেশ কিছু কাজ করতে হবে। আর সেটা যদি না পারে তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বেশি ঋণ করতে হবে সরকারকে। সেটা করতে গেলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে হয়তো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নিতে পারবে। তাহলে ৫ লাখ আর ২ লাখ ২০ হাজার যোগ করলে ৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া সমীচীন হবে।’
রাজস্ব আদায়ে গতানুগতিকতা তাগিদ দিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে অন্তত ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকাও যদি তুলতে পারে তাহলেই তো ৫ লাখের কাছাকাছি যাওয়া যাবে। প্রশাসনের দুর্নীতি এবং অদক্ষতা আছে। এখন এনবিআরকে ভেঙে নীতি এবং আদায় নতুন দুটো বিভাগ করা হয়েছে। এটা এই সরকারের বিরাট এক অর্জন। এর ফলে রাজস্ব আহরণে স্বচ্চতা আসবে। বাড়বে আদায়।’
বাজেটে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আর কমানোর জায়গার মধ্যে রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আর ভর্তুকি। এডিপিতে কমানোর জায়গা হচ্ছে প্রকল্প ব্যয়। সেখানে তিনটা জায়গা আছে। এর মধ্যে ভ্রমণ, ভবন এবং বাহন। এসব জায়গায় প্রচুর অর্থের অপচয় হয়। উন্নয়ন বাজেটে এই ব্যয়গুলো বেশি হয়। ফলে এ দিকে নজর দিতে হবে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যায়, সিঁড়ির নিচে মানুষ শুয়ে আছেন, একটু চিকিৎসা পাওয়ার জন্য। সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক এবং নার্স নেই। তার পরও কেন স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ খরচ করতে পারে না, সেটা বড় প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে এবং সঠিক জায়গায় খরচ করতে হবে। খাদ্য এবং কৃষির সার সেচে ভর্তুকি কমানোর সুযোগ না থাকলেও কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে কিছুটা খরচ কমানোর সুযোগ আছে। কেননা, সেখানে প্রচুর অপচয় হয়। জ্বালানি খাতেও প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়। সেখানে খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমাতে হবে। এ ছাড়া রপ্তানিতে যে প্রণোদনা আছে সেখানেও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’
বাজেটে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলডিসি উত্তরণ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ট্যারিফ মোকাবিলা করার জন্য আমদানি শুল্ক কমাতে হবে। এটা কমানো মানে মূল্যস্ফীতির প্রভাব ইতিবাচক হবে। আমাদের প্রটেকশন রেট অনেক বেশি। এটাকে নামাতে হবে। তাহলে এলডিসি উত্তরণও সহজ হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দর-কষাকষি সহজ হবে। কিন্তু এটা কমালে আবার রাজস্ব আদায়ে বড় অঙ্কের ক্ষতি হবে। সেটা কোথা থেকে পোষাবে সরকার। সেটা করতে গিয়ে হয়তো আয়কর বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি আয়কর না বাড়িয়ে কর ফাঁকির জায়গাগুলোতে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে।’
বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে ড. জাহিদ বলেন, ‘ঘাটতি যদি ২ লাখ ২০ হাজার কোটি বা এর নিচে থাকে তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারণ এটাকে মোটামুটি অর্থায়নযোগ্য ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এবার হয়তো ব্যাংক থেকে ৯৯ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করছে সরকার।’
কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাজেটে তেমন কিছু করার নেই। একটা কাজ করতে পারে, সেটা হচ্ছে দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি। যেটা ২০১০ সালে ভারতের একটা প্রকল্পকে অনুকরণ করে করা হয়েছিল। ওই সময় ৮০টা গরিব উপজেলাকে কেন্দ্র করে এটা করা হয়েছিল। কর্মসূচিটি এখনো বহাল আছে। তবে কী অবস্থায় আছে জানি না। এই কর্মসূচি অনুযায়ী দরিদ্র মানুষ যদি আর কোথাও কাজ করতে না পারে, তাহলে ইউনিয়ন কাউন্সিলে গিয়ে আবেদন করে লিস্টেড হতে হবে।’
‘যদিও সেখানে যে মজুরি দেওয়া হয়, তা বাজারের চেয়ে কম। এর কারণ হচ্ছে প্রথমে যেন সে বাজারে গিয়ে চেষ্টা করে। সেই কর্মসূচি যেন চালু থাকে এবং আমি শুনেছি এবার সেই কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কারণ এটা সরাসরি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। অনেকটা ইন্স্যুরেন্সের মতো। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত সমস্যাগুলো আছে, সংস্কারের মাধ্যমে সেই বাধাগুলো দূর করা দরকার। যেমন ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি খাতের সংস্কারসহ যেসব সংস্কারের কথা সরকার শুরু থেকে বলে আসছে, এবারের বাজেট বক্তৃতায় বলা উচিত, তারা চলে যাওয়ার আগে কোন কোন সংস্কার শেষ হবে। কয়টা ব্যাংককে নিষ্পত্তি করে দিয়ে যাবে। কয়টা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু কবে?’-যোগ করেন জাহিদ হোসেন।