বুধবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, সকাল ৮:৫৩

দেশ আজ অপকর্মের অনন্য রোল-মডেলের আসনে: রিন্টু আনোয়ার

দুর্নীতিবাজ,ঠক,ঘুষ-মুনাফাখোর, কালোবাজারিসহ অপরাধীচক্রের কাছে দুর্যোগ- মহামারি যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। চলমান করোনা কালের সময়টাকে গোটা বাংলাদেশ গ্রাস করার মৌসুম হিসেবে নিয়েছে তারা। দেশকে নিয়ে যাচ্ছে অপকর্মের অনন্য রোল-মডেলের আসনে। করোনার উছিলায় অভিনব নানা পথ আবিস্কার করে চলছে তারা। যেখানে সভ্য দেশগুলো যদ্দূর সম্ভব বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন মেনে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছে, সেখানে আমাদের ধরিবাজরা যে যেভাবে পারছে অর্থ হাতানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। এর মানবতাকে পিষে মেরে সরকারকেও পদে পদে হোঁচট খাওয়াচ্ছে।তাদের কুকর্মের দায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চাপছে সরকারের ওপরই এবং তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
করোনা কালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সেই গোড়া থেকে টেস্ট টেস্ট এ্যান্ড টেস্ট অর্থাৎ বেশি বেশি পরীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। আমরা এর উল্টো পথে। সারা বিশ্ব নমুনা পরীক্ষা অবারিত রেখেছে। কোথাও কোথাও র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং টেস্ট চলছে। আর আমাদের এখানে টেস্ট ব্যবস্থা হচ্ছে কুক্ষিগত। সেটা রয়েছে পছন্দের এজেন্ট বা তথাকথিত সাহেদদের কব্জায়। সভ্য দুনিয়া জনগনকে টেস্টে উৎসাহিত করতে ফ্রি টেস্টের ব্যবস্থা নিলেও এক পর্যায়ে এসে বাংলাদেশে ফি ধরা হয়েছে। করোনা মোকাবিলার স্বীকৃত রোল মডেল হচ্ছে যত টেস্ট তত সনাক্ত, তত কম সংক্রমন। যত সনাক্ত তত আইসোলেশন, তত চিকিৎসা এবং তত সুস্থতা। আমরা উল্টো পথে। যত কম টেস্ট, তত কম সনাক্ত, তত কম মৃত্যু। কম টেস্টের মাধ্যমে মৃত্যু হার ও আক্রান্ত বা সনাক্তের সংখ্যা কম দেখানো যায়। সারা দুনিয়ায় করোনা আক্রান্তদেরকে রোগী বলা হলেও আমরা তাদেরকে শুধু ‘সনাক্ত’ বলছি।
এই সনাক্তদের মধ্যে কেউ মারা গেলে কেবল সেটাই হিসাবে আসছে। অ-সনাক্ত মৃতদেরকে ‘লক্ষণ’ বা ‘উপসর্গ’ ক্যাটাগরিতে ফেলে মৃত্যু কম দেখানোর সাফল্য এক নিষ্ঠুরতা। এ থেকে বাঁচতে মানুষ হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় বসে চিকিৎসা নেয়াকেই নিরাপদ মনে করে। এর মাধ্যমে অবশ্য মানুষকে হাসপাতালবিমুখ করায় সাফল্য এসেছে। ধুরন্দররা এ পরিস্থিতিকে মওকা হিসেবে নিয়েছে। করোনা হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ বেড খালি! কয়েকদিন আগেও আইসিইউ না পেয়ে মানুষ মারা গেলেও হালে সেখানে রোগী নাই! রোগী নাই তো করোনাও নাই।তারা স্যাম্পল সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই নেগেটিভ-পজিটিভের বাণিজ্য নিশ্চিৎ করেছে। ভুয়া করোনা পরীক্ষা, ভুয়া করোনা সনদ ও ভুয়া মাস্কে তারা চাঁদ কপালে।
বিশ্বের কোন দেশে এমন কোন ডাক্তার বৈজ্ঞানিক জন্ম নেননি, যারা কিট এবং টেস্ট ছাড়াই নমুনা পরীক্ষার রেজাল্ট দিতে পারেন। আমাদের এখানে তা অবলীলায় করা হয়। সম্প্রতি রিজেন্ট জেকেসি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ফলে এর মধ্যেই খুলতে খুলতে একে একে আমরা সব খুলে দিগম্বর হয়ে গেছি। এখন জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক। রাস্তায় মার্কেটে ব্যাংকে বাজারে মানুষের উপচেপড়া ভীড়। মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে করোনাযুদ্ধে সাফল্যের সনদ দিয়েও দিতে পারে। হুজুগের বাঙালির সঙ্গে হুজরতি ফলানো সহজ। বিদেশের সঙ্গে ততো সহজ না হওয়ায় আমাদের এরইমধ্যে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন বাংলাদেশের সাথে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশি যাত্রীদের ” ভাইরাস বোমা” আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইতালির গণমাধ্যমে এটা ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে। ঢাকা থেকে করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে যাওয়া যাত্রীদের ইতালি বিমানবন্দরে পরীক্ষা করে করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এ ঘটনায় সব যাত্রীসহ ফ্লাইট ফেরত পাঠানোসহ ইতালি বাংলাদেশের সাথে বিমান যোগাযোগ আপতত বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে একই ঘটনায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি দেশ ও এয়ার লাইন্স করোনা টেস্ট নিয়ে ঢাকায় কি হচ্ছে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। এ কেলেংকারি ও দুর্নীতির ঘটনায় এভিয়েশন ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞায় পড়ার আশংকা রয়েছে বাংলাদেশের। রিজেন্ট হাসপাতালের সাম্প্রতিক কেলেংকারি সারা বিশ্বেই এখন একটি আলোচিত ঘটনা। তথাকথিত এ হাসপাতাল ১০ হাজার নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। র‍্যাবের হাতেই সাড়ে ৪ হাজার ভুয়া সনদ ধরা পড়েছে। এর আগে জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার-জেকেসি নামের আরেকটি হাসপাতাল করোনা টেস্ট নিয়ে একই জালিয়াতি করেছে। এর মালিক আরিফুল হক ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনাও দুর্যোগবাণিজ্যে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। আওয়ামী লীগ উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলামের কোম্পানি এলান করপোরেশন ডাক্তারদের ব্যবহারের জন্য ৫০ হাজার ভুয়া মাস্ক হেলথ মিনিস্ট্রিকে সরবরাহ করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল,জেকেসি ও এলান করপোরেশনের এই কেলেংকারি করোনা মহামারির এ দুঃসময়ে বাংলাদেশকে নতুন করে বিপদে ফেললেও দায় পড়ছে সরকারের ঘাড়ে।
প্রবাসীদের পাঠানো টাকা বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় অবদান। এটা দিয়েই বাংলাদেশ বেঁচে আছে বলা যায়। বর্তমান সংকটজনক সময়েও গত জুন মাসে দেশে প্রবাসীদের টাকা এসেছে এক মাসে সর্বোচ্চ ১৮৩ কোটি ডলার বা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ক’একজন পাপুল,শাহেদের মতো অসাধু ব্যক্তির কারনে বিদেশি কর্মসংস্থানের এতবড় সুযোগটি ধ্বংস হয়ে গেলে বাংলাদেশের দাঁড়ানোর আর জায়গা থাকবে না।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের কপালে দুর্নীতির তিলক তো আছেই, পাশাপাশি শেয়ারবাজার,বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুট,  সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, ধর্ষন, ক্যাসিনোর সঙ্গে মহামারি বাণিজ্য বাংলাদেশকে কলঙ্কতিলক এঁটে দিয়েছে। পাপের কলস পূর্ণ করে এরা ধরা পড়লেই বা কী? কী হয়েছে তাতে? এই পালের তো হাত মেলে, সেল্ফি ওঠে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাহিনী প্রধানের সঙ্গেও। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে এদের ছদ্মবেশ কেউই যেন আঁচই করতে পারেনি! নাকি করেও চুপ ছিল?  ঘটনার পর ঘটনা ও ইস্যুর তোড়ে এদের নিয়ে গোলমাল হয়তো মিটে যাবে। সব ল্যাঠা চুকে যাবে। কিন্তু থেকে যাবে তাদের সাথের মানুষগুলোর ভুবন মোহিনী হাসির ছবি। যেসব ছবি পত্র পত্রিকা আর ফেসবুকে ঘুরছে নিয়মিত। তবে, তাদের জন্য আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে-এদের স্রষ্টাদের বিচার এ দেশে হয় না। কিন্তু এদের যারা তৈরি করে, এদেরকে শাহেদ হয়ে উঠার, পাপিয়া হয়ে উঠার সুযোগ করে দেয় তারা নিরাপদেই থাকেন।
শাহেদ,পাপিয়া,পাপুলরা কেউ কি জন্মগত ভাবে অপরাধী?এ প্রশ্নের বিহিত আজতক হয়নি। ঘটনার পর কয়েকদিন মাতামাতির তারপর মানুষও সব ভুলে যায়। যা এপর্যন্ত দেখা গেছে।লুটপাট করার মাধ্যম হিসেবেই এদেরকে যেন তৈরি করা হয়েছে। “উলোটপালোট করে দেয় মা লুটেপুটে খাই” বাস্তায়নে এরা উত্তম প্রোডাক্ট। তাই ঘটনাচক্রে মাঝে মাঝে শাহেদ,পাপিয়া, পাপুলরা ধরা পড়বে। হয়তো টুকটাক বিচারও হবে। নইলে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। এক সাহেদ যাবে তো শত সাহেদের জন্ম হবে, এক পাপিয়া যাবে তো হাজার পাপিয়া ভূমিষ্ট হবে। বিভিন্ন রূপে এরা শত শত গজাবে। এদের সেল্ফি ও যুগল ছবিগুলো সেই বার্তাই দেয়। সমাজের চিত্র জানান দেয়। কে এই দুষ্ট চক্রের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে না, সেটা নির্নয় করা কঠিন। ফেসবুকে ঘুরতে থাকা এদের সেল্ফিগুলোর মধ্যে মুখে হাসি নেই বা ক্লিকের সময় খুশি ছিলেন না এমন একজনও দেখা যায়নি। প্রশ্ন তো আসতেই পারে সাহেদরা কি তখন মধু ছিলো যে তার সাথে হাসিমুখ না হলে চলে না?  সম্পর্ক মধুর না হলে এতো মিষ্টি হাসি বের হয়? আর এ-ই মধুর সম্পর্ক কি আর্থিক না ভিন্ন কোনো অনুগামিতার? কারোই অজানা বা অবুঝের বিষয় নয় যে, একমাত্র আর্থিক সংগতিই একজন অজ্ঞাত অখ্যাতকে রাতারাতি নক্ষত্রতুল্য করে তুলতে পারে। সাহেদ এর একটি উদাহরণ মাত্র। প্রতারণার এই শিল্পিত রুপ ছাড়াও আরো বহু রয়েছে। এমপি পাপুল, সাবেক এমপি বদি, ঠিকাদার মিঠু, জিকে শামীম, যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়া, জিকেজির আরিফুল এবং ডাঃ সাবরিনা, আরিফুলসহ অনেকেই এখন তারা একই সারির অলঙ্কার। বহুজনের আইকন। স্বপ্নসারথি। ওরা যেখানে ভুল করেছে, সিড়ি হারিয়েছে সেই জায়গাটা পরবর্তীরা চিনে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। তাদের চেয়েও বড়ো ওস্তাদ বা গুরু যে নেই-সেটা কি বলা যায়? যারা নীরবে এরচেয়েও ভয়ঙ্কর কায়কারবার করে যাচ্ছে। ধরা না পড়লে চালিয়ে যাবে সবই। এদের টাকায় আয়েশি জীবনের ব্যবস্থা হয় বলে, যেচে পড়েই তাদের প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব নিয়ে নেন রাজনীতিক-ব্যবসায়ি, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। বাদ নেই সাংবাদিকরাও। এতো মদদে ককুকর্মের চাষবাস এখন অনেক বেশি নিরাপদ। চুরি-জোচ্চুরি, দুর্নীতি-ঠকবাজির ফলন বাম্পার হচ্ছে। হয়ে চলছে। নমুনায় বলছে হবেও। যতোক্ষণ পর্যন্ত এসব প্রোডাক্টের কারখানা বন্ধ না হবে তদ্দিন এসব মাল উৎপন্ন হবে, হতেই থাকবে। তখন একটা কলার দাম এক হাজার টাকা হবে,একটা ডিমের দাম দুহাজার টাকা হবে, একটা বালিশের মূল্য এক লাখ টাকা হবে এবং তা হতেই থাকবে। ভাগে গোলমাল বা কোনো ভুলবুঝাবুঝির ঘটনায় মাঝেমধ্যে দুয়েকটা ধরা পড়বে,পড়ছে। যার কারণে কয়েকদিন তোলপাড় হয় এবং ক’দিন পর আবার থেমে যায় বা যাবে। সামনে আসবে আবার নতুন আরেকটা ঘটনা।মানুষও আগেরটা ভুলে যাচ্ছে। ক’দিন পরেই চেয়ে চেয়ে দেখে টাটকা নতুনটা। ফলে এসব ঘটনা বাংলাদেশকে খাদের কোন কিনারায় নিয়ে যায় সেটাই এখন বড় ভয়।।

লেখকঃসাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন...

Developed by: Engineer BD Network