শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, সকাল ৬:০৬
শিরোনাম :
বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিলো বলেই আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি – ড. হারুন অর রশিদ বিশ্বাস মুলাদীতে শারদীয় দুর্গোৎসবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের মতবিনিময় খুলনায় স্বদেশ ইসলামী লাইফের বিশেষ উন্নয়ন সভা ঢাকা এঞ্জেল লায়ন্স ক্লাবের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন, খাদ্য ও মাস্ক বিতরন ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স টাঙ্গাইল জেলা যুবলীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর রাজশাহী বিভাগের উন্নয়ন সভা এনআরবি ইসলামিক লাইফের ব্যবসা উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত মুজিববর্ষ বধির দাবা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

আর্থসামাজিকতা তছনছ : মধ্যবিত্ত ঠেকছে নিম্নবিত্তে -রিন্টু আনোয়ার

করোনা ঘাতক আমাদের মত উন্নয়নশীল বা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য চরম দুঃসংবাদ ডেকে আনবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল আগ থেকেই। কিন্তু, সেই সতর্কতা তেমন আমল পায়নি। বেশি বা অতি ধরনের কিছু বলে তাচ্ছিল্যও ছিল। এখন কি সেই শঙ্কিত দশাতেই পড়ছি না?  সচরাচর এ রকম বৈশ্বিক দুর্যোগ বা মহামারির আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে আগাম আলোচনাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। তাই আগাম প্রস্তুতিও থাকে না। তখন মহামারি পরবর্তী দূর্যোগ-দূর্ভিক্ষ বা অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে বেগ পেতে হয়। জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ কোনো কোনো মহল থেকে এবার বলা হয়েছিল, রোগটির কারণে যতটা না ক্ষতি হবে, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি হবে পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দায়।
করোনার হানার বেশ আগে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে গত ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশই দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বব্যাংক ব্যক্তিগত আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য পরিমাপ করে। দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম আয় করলে ওই ব্যক্তিকে গরিব হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের হিসাবে, ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। অতিদারিদ্র্যের হার সাড়ে ১০ শতাংশ।  সেই হিসাবে দেশে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ গরিব। তাদের পৌনে দুই কোটি হতদরিদ্র। প্রায় এক বছর আগের এসব মূল্যায়নকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। উপরন্ত, দেশকে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, আমেরিকার কাতারে দাবি করার প্রতিযোগিতা চলেছে। করোনা সব ঝাড়িঝুড়ি ফাঁস করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের দশা বেশি উদাম হলেও অর্থনৈতিক চিত্রও গোপণ থাকেনি।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, অর্থনীতি এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বের অন্তত তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, করোনার কারণে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বের প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশ কমে যেতে পারে। অন্যদিকে,  করোনার জেরে বিশ্বের মানুষ বিশুদ্ধ খাবার, ফল আর সবজি সঙ্কটে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ফাও। কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়েছিল, গত দুই দশকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা অনেক পরিবার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। স্বল্প পুঁজির অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজি হারাবে, অনেক মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প। গার্মেন্টস শ্রমিক ও স্বল্প বেতনের চাকুরিজীবীসহ দেশের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে যেতে পারে।
দেশের হাল পরিস্থিতি অনেকটা তেমনই। করোনা মধ্যবিত্তকে নিম্নবিত্তের কাতারে নিয়ে যাচ্ছে। আর নিম্নবিত্তকে দাবড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিত্তশূণ্যের দিকে। করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নানা কারণে ত্রাণ তৎপরতায় দেখা গেছে। মহামারি দীর্ঘায়িত হতে থাকলে তারাও কেটে পড়তে থাকেন। নিজের কাভারেজের জন্য হলেও তাদের উছিলায় নিম্নশ্রেণিটা কিছু না কিছু পেতে যাচ্ছিল। সেটাও এখন বরবাদ। আবার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা নেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। তাদের অনেকের অবস্থা এখন চরমের চেয়েও চরমে। নিয়মিত চাকুরিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, কিন্তু দিনযাপন রীতিমতো কষ্টকর হয়ে পড়েছে পরিবহণ শ্রমিক, গার্মেন্টস কর্মী, বিভিন্ন ধরণের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরাও – যাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হয়নি অথবা চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। গ্রাম বা মফস্বল থেকে বিভিন্ন শহরে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিপদে পড়েছেন। আবাসিক হলে বা বাসা ভাড়া করে থাকা এই শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ তাদের খরচ সামলান শিক্ষার্থী পড়িয়ে। কিন্তু অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার ফলে তাদের উপার্জনের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরতদের অনেকে বেতন পাচ্ছেন না। সঞ্চিত অর্থ শেষের পথে। অনেকে চাকুরি হারানোর শঙ্কায়।  তুলনামূলক বেশি দুর্বিপাকে তারাই। চাকরি থাকলেও তাদের অনেকের বেতন নেমে এসেছে অর্ধেকে। বাড়িভাড়া, করোনা মোকাবিলায় সুরক্ষা ব্যবস্থা, খাদ্যসহ সন্তানসন্ততি নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। করোনায় মানুষের দুর্গতি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অবস্থা নিয়ে কিছু গবেষণা চলছে। গবেষণার কিছু ফলাফলও প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান- (বিআইডিএস) বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, ব্র্যাক, ডেটাসেন্স, উন্নয়ন সমন্বয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তথ্য ভালো বার্তা দেয় না। গবেষকরা জানিয়েছেন, মার্চের শুরুর দিকে দেশে যেখানে দরিদ্রদের সংখ্যা ২১ শতাংশের মতো ছিল, সেটা এখন দাঁড়িয়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ। অর্থাৎ আগে যেখানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল তিন কোটি, সেটা এখন হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি। গবেষকরা আরও জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশই মধ্যবিত্ত। করোনার কারণে এদের ১৫-২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ।
মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে অসুবিধা তারা নিজের সমস্যা প্রকাশ করতে পারে না। তাদের নিয়ে কথাবার্তাও কম। মনে করা হয়, এরা কোনোভাবে বেঁচে যাবে। একদম না খেয়ে মরবে না। প্রয়োজনে একবেলা খাবে। বাসাবাড়ি ছেড়ে লাগলে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেবে। বাস্তব তা নয়। লজ্জা লুকিয়ে শ্বশুর বাড়ি নয়, তাদের অনেকে সন্তানসন্ততি নিয়ে শহর ছাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে এখন টু-লেটের ছড়াছড়ি। যা নজিরবিহীন। কিছু কিছু বাড়ির মালিক মহামারীর সময়ে ভাড়া নিজ থেকেই কিছুটা কমিয়ে দিলেও অধিকাংশ বাড়ির মালিক তা করেননি। ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি সংগঠনের তথ্যমতে, মার্চের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার পরিবার ঢাকা ছেড়েছে। সরকারের এ ক্ষেত্রে করনীয় তেমন কিছু নেইও। সরকার যদি কিছু করে সেটা প্রথমে করতে হবে দরিদ্রদের জন্য। এটাই প্রথা। চাকরিই মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন আয়ের মূল উৎস। এখন গোটা চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, এর প্রথম ধাক্কাটা এসেছে মধ্যবিত্তের ওপর। আগে দেশে গরিব (হতদরিদ্র) মানুষ মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ ছিল। এখন সেটা ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। মধ্যবিত্তের এ সংকট থেকে দেশে বেকারত্ব বাড়াবে। সেইসঙ্গে বাড়িয়ে চলছে দরিদ্রের সংখ্যা। হতদরিদ্রদের আয়ের উৎস কখনই একরকম ছিল না। তাই তাদের আয়ের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার পথ থাকে। কিন্তু মধ্যবিত্তের তা নেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণিটা দরিদ্র কাতারে চলে যেতে থাকায় সংখ্যাটা দ্রুত বাড়তির দিকে। তারা গাড়িচালক, ছুটা বুয়া, ছোটখাটো দোকানদার, বাদাম-চানাচুর বিক্রেতা হবে তাও নয়।  প্রথমে সংকুচিত হবে। পরে কোথায় কোনটা করবে এখনই বলা যায় না। অবস্থাটা সাময়িক হবে, না দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটা নির্ভর করবে অর্থনীতি কত তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াবে, আগের অবস্থায় যেতে পারবে কি না, পারলেও কবে পারবে, সেটার ওপর।
করোনায় বেঁচে যাওয়াদের কী হবে? জীবিকার সঙ্গে জীবনেরই বা কী গতি হবে? দেশ অপুষ্টিতে ভোগা মানুষে ভরে না তো? ভিটামিনহীন হয়ে বেঁচে থাকার পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে? প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক হলেও ভাবনায় আসছে না সেভাবে। সুস্থ-স্বাভাবিক বা নিরোগভাবে বেঁচে থাকতে এমনিতেই প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাদ্য থেকে বঞ্চিত নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ। সারাবছর অপুষ্টিতে ভোগেন তারা। তারওপর এই করোনা দুর্যোগে তারা আরো পুষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। শুধু চাল-ডাল-তেল-আলুর বাইরে আরো কিছু ভাগ্যে জুটছে না এই শ্রেণিটির। মাছ-মাংস-ডিম, শাক-সবজি ও ফলমূলসহ প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাদ্য না পাওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে চলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের বুলেটিনে করোনার ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় । নিম্নবিত্তরা পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে কি? সরকারিভাবে এখনো কোনো উদ্যোগ কি নেয়া হয়েছে পুষ্টি জোগানোর? নিম্ন আয়ের মানুষ উপার্জনহীন হয়ে পড়ায় পুষ্টিকর দূরে থাক স্বাভাবিক খাদ্য জোগাড়ই কঠিন হয়ে পড়েছে। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে এবং সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম ইত্যাদি খনিজ তাদের পেটে যায় না। অর্থাৎ বেঁচে গেলেও অপুষ্টিতেই থাকছে তারা। অপুষ্টিজনিত কারণে একদিকে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়ায় রোগাক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে কোষগুলোর কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন,  করোনায় মৃত্যুহার কমানোর প্রধান উপায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। সেটার জন্য খাদ্য তালিকায় উজ্জ্বল রঙের ফল কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আম,আনার, তরমুজ, বেরি, জলপাই, আনারস এবং পারপেল-লাল পাতা কপি, বিট, ব্রোকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্টি আলু ও ক্যাপসিকামসহ উজ্জ্বল রঙের সবজি, ডিম, সবুজ শাক, মুরগির মাংস, কলিজা, দুধ জাতীয় খাবার, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তা বাদাম, বাদাম তেল, ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, আমলকী, লেবুসহ বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, ই, সি সমৃদ্ধ খাবার রাখার কথা বলছেন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। যেখানে চাল-আলু-ডালই জোগাড়ের অবস্থা নেই, সেখানে এই ম্যানু বাতলানো মশকরার নামান্তর। ত্রাণের আলু ভর্তা-ভাজি খেতে যে- তেল-পিঁয়াজ-মরিচ-লবণ লাগবে তা কেনার টাকাই যাদের হাতে নেই তাদেরকে ফল-মূল, মাছ-মাংস, ডিম-দুধ খাওয়ার কথা বলা শুধু পরিহাস নয়, নিষ্ঠুরতাও বটে।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন...

Developed by: Engineer BD Network