

জেলা প্রতিনিধি, ভোলা : ভোলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় নারী শিক্ষকদের বরাদ্দকৃত খাবারের টাকা নয়ছয় করার তথ্য পাওয়া গেছে। নির্ধারিত বাজেটের অর্ধেকের কাছাকাছি টাকা পকেটে পুরে শিক্ষকদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করার অভিযোগ উঠেছে জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোলা জেলায় ‘হেলথ সিস্টেম স্টেন্থনিং ফর প্রাইমারী হেলথ কেয়ার (এইচএসএস৪পিএইচসি)’ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত ৭০ জন নারী শিক্ষকের জন্য ৩ দিনব্যাপী ‘‘টিচার ট্রেনিং অন লাইফ স্কিল এডুকেশন (এলএসই)’’ শীর্ষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। কনসার্নড উইমেন ফর ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট (সিডব্লিউএফডি)-এর বাস্তবায়নে এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) অর্থায়নে জেলা শিক্ষা অফিস ও সিডব্লিউএফডি যৌথভাবে এ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।
প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ী, প্রতি জন শিক্ষকের জন্য দৈনিক সকাল ও বিকালের নাস্তা বাবদ ২৫০ টাকা এবং দুপুরের খাবারের জন্য ৪০০ টাকা বরাদ্দ ছিল। সেই হিসাবে জনপ্রতি দৈনিক ৬৫০ টাকা হারে ৭০ জন শিক্ষকের ৩ দিনের মোট খাবার বিল বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
তবে বাস্তব চিত্রে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। জেলা শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ.কে.এম ছালেহ্ উদ্দিন, জেলা শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী কাম ক্লার্ক মো. জাহিদ হোসেন এবং সিডব্লিউএফডি এনজিওর ডকুমেন্টেশন অফিসার মো. নাজমুল হুদা মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করে বড় অঙ্কের অর্থ পকেটে পুরেছেন।
খাবার ক্রয় করা ভোলার দুই দোকানের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিদিন সকালে আনুমানিক ৮০ টাকার নাস্তা, ৩৫ টাকার বিকালের নাস্তা এবং দুপুরে ২৫০ টাকার খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তাও আবার ৩ দিন ধরে একই বাজেটের মেনু পরিবেশন করা হয়।
এই হিসেবে, ১ জন শিক্ষকের জন্য ৩ দিনে খাবারের মোট খরচ দাঁড়ায় মাত্র ১,৪১০ টাকা । ৭০ জন শিক্ষকের জন্য ৩ দিনে প্রকৃতপক্ষে খরচ করা হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৯৮ হাজার ৫৫০ টাকা।
প্রকল্পের বাজেট থেকে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও, বাস্তবে ৯৮ হাজার ৫৫০ টাকা খরচ করে অবশিষ্ট ৭৬ হাজার ৪৫০ টাকা (বরাদ্দের ৪৩% এরও বেশি) আত্মসাৎ করেছে ওই চক্রটি।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক প্রশিক্ষণার্থী নারী শিক্ষক বলেন, “আমাদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট থাকা সত্ত্বেও ৩ দিন ধরে একই খাবার খাইয়ে চরম অবহেলা করা হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী সঠিক আপ্যায়ন পাব, কিন্তু কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এমন খাবার খেতে হলো।
অভিযোগের ব্যাপারে সিডব্লিউএফডি এনজিওর ডকুমেন্টেশন অফিসার মো. নাজমুল হুদা বলেন, আমরা শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েছি। শিক্ষকদের সম্মানি এবং খাবারের ব্যবস্থা করেছেন জেলা শিক্ষা অফিসার ও হিসাবরক্ষক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ, কে, এম ছালেহ্ উদ্দিন বলেন, খাবারের ব্যবস্থা আমি করিনি, এনজিওর লোক করেছেন। আর বরাদ্দের সম্পূর্ণ টাকাই ব্যয় করা হয়েছে। আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাই না।
প্রশিক্ষণার্থীদের দাবি, জাতিসংঘের অর্থায়নে পরিচালিত এ ধরনের মহৎ উদ্যোগে স্থানীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট এনজিও প্রতিনিধিদের এমন কর্মকাণ্ড অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা।
উল্লেখ যে, জেলা শিক্ষা অফিসের ছালেহ্ উদ্দিন-জাহিদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাইন্স প্রজেক্টের অর্থ, এনটিআরসিএর কারিগরি বই ক্যারিং খরচ, জরিপের টাকা, তেলে ও গাড়ি মেরামতের ভুয়া ভাউচার করে সরকারি বিল উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এসব অনিয়মের সংবাদ থাকছে ২ পর্বের প্রতিবেদনে।