

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)-এ দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনিক সূত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমানের নামকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসনিক ক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ, বদলি-পদায়ন, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং টেন্ডার ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন!
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের দাবিতে বলা হয়েছে, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কিংবা বেনামে রাজধানীর বারিধারা, পূর্বাচল, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের নিজ এলাকায়ও বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, এসব সম্পদের পরিমাণ ও বৈধ আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এ.কে.এম আজাদ রহমানের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রুথ কমিশন ও বিভাগীয় মামলার ইতিহাস
সরকারি নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সত্য ও জবাবদিহিতা (ট্রুথ) কমিশনে উপস্থিত হয়ে একটি প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতির ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নং-০২/২০১২ দায়ের হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয় এবং বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।
বদলি-পদায়ন ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
একাধিক প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, সওজে পছন্দের পদায়ন, বদলি, প্রকল্প অনুমোদন এবং টেন্ডার ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে।অভিযোগে বলা হয়েছে, এ.কে.এম আজাদ রহমান এই নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী নুরু ইসলাম বিভিন্ন প্রকল্প ও টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশ সফর নিয়েও প্রশ্ন!
অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশ সফর অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়নমূলক সফরের আড়ালে অর্থপাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংস্কারের বদলে পুনঃপদায়ন?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, প্রশাসনিক সংস্কারের প্রত্যাশার মধ্যেও বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ বদলিতে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়নের বিষয়টিও নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বলে তারা দাবি করেন।তাদের ভাষ্য, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অতীতের অভিযোগ, সম্পদের উৎস, বিভাগীয় মামলার ইতিহাস এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি,
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি।
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান ও প্রকৌশলী নুরু ইসলামের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।