

এম. রওশন আলম : শাহজাদপুর হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর পবিত্র মসজিদ ও মাজার শরীফের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত নির্মাণকাল ও নির্মাতা : একাদশ শতাব্দীর কোন এক সময় এই প্রাচীনতম মসজিদ নির্মাণ করা হয়। ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে ইয়ামেনের শাসনকর্তা, হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুয়াজ-ইবনে জাবাল (রাঃ) এর বংশধর হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) শাহজাদপুর আগমন করে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
স্থাপত্য রীতি : ১৫৭৬ ক্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নির্মিত ইমারত সমূহকে সুলতান স্থাপত্য রীতি এর ১৫৭৬ ক্রিস্টাব্দের পর থেকে ১৭৫৭ ক্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত ইমারত সমূহকে যথারীতির আওতাভুক্ত করা হয়। শাহজাদপুর মসজিদটি বাংলার সুলতানী আমলে স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে অধিক পরিচয়বাহী একটি ইমারত।
মসজিদের কিছু তথ্য: বাংলার সুলতানী আমলে মুসলিম স্থাপত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়বাহী ধর্মীয় ইমারত বলে খ্যাত হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর নির্দেশে মসজিদটি নির্মিত হয়, যার ভিতরের মাপ-দৈর্ঘ্য ৫১ফুট ৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩১ফুট ৫ইঞ্চি এবং উচ্চতা ১৬ফুট ২ইঞ্চি। বাহিরের- দৈর্ঘ্য ৬২ফুট ৯ইঞ্চি, প্রস্থ ৪১ফুট ৯.৫ইঞ্চি এবং উচ্চতা ১৯ফুট ১০ইঞ্চি। দেওয়াল ৫ফুট ৭ইঞ্চি পুরু। মোট ৫টি দরজা, প্রতিটির উচ্চতা ৭ফুট ৫ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৬ফুট ৩.৫ ইঞ্চি। মোট গম্বুজের সংখ্যা ১৫টি। মেঝে হতে গম্বুজের শীর্ষ পর্যন্ত উচ্চতা ২০ফুট ৯ইঞ্চি। ইট, চুন ও শুরকি দ্বারা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদটিকে ধারণ করে রেখেছে কালো পাথরের মোট ২৪টি স্তম্ভ। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদের নাম “মখদুমিয়া জামে মসজিদ”। যা করতোয়া নদীর তীরে অধ্যবধি দন্ডায়মান।
মাজারের কিছু ইতিবৃত্ত কিংবদন্তী থেকে জানা যায় ইয়ামেনের শাহাজাদা হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) তার নামানুসারে এই স্থানের নামকরণ করা হয়েছে শাহজাদপুর।
কথিত আছে যে, হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) ১১৯২-১১৯৬ সালের মধ্যে ইয়ামেন থেকে ইসলাম ধর্মপ্রচারার্থে যাত্রা শুরু করে বোখারা শহরে আগমন করেন। বোখারা শহরে হযরত জালাল উদ্দিন বোখারী (রহঃ) এর দরবার শরীফে তার সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করে তিনি বাংলার পথে যাত্রা শুরু করে বাংলার এই অঞ্চলে আগমন করেন। হযরত জালাল উদ্দিন বোখারী (রহঃ) এক জোড়া কবুতর উপহার দেন যাহা জালালী কবুতর নামে পরিচিত। তিনি বাংলায় প্রবেশ করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করলে তৎকালীন সুবা বিহারের অমুসলিম অধিপতি “রাজা বিক্রম কেশরী” হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর আগমনে ক্ষিপ্ত হয়ে তার সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে। কিন্তু সৈন্য বাহিনী যুদ্ধে পরাস্থ হয়ে ফিরে যায়। রাজা বিক্রম কেশর পরপর কয়েকবার সৈনা প্রেরণ করে যুদ্ধে পরাস্থ হয়, ইতিমধ্যে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) শাহজাদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। তার আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা এই অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিনত করেন।
শেষ যুদ্ধে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এবং তাঁর বহু সঙ্গী ও অনুসারী যোদ্ধা শহীদ হন, এই ধর্ম যুদ্ধে তাঁর শহীদ হওয়ার কারণে তিনি হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) নামে পরিচিতি লাভ করেন, কথিত আছে যে, পূর্ববর্তী যুদ্ধে পরাজিত বন্দি সৈন্যদের একজন গুপ্তচর হিসাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর অত্যন্ত নিকটস্থান লাভ করেন। শেষ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আসরের নামাজ আদায় করার সময়ে সেজদারত অবস্থায় হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর মস্তক মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সুবা-এ-বিহারের রাজধানী মঙ্গলকোট মতান্তরে মহলকোট রাজার নিকটে নিয়ে উপস্থিত হয়।
হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর মস্তক মোবারক রাজার সম্মুখে হাজির করার পর দেখা যায় যে তাহার উষ্ঠাধর হতে অলৌকিক ভাবে সুবাহানা-রব্বি-ইয়াল-আলা উচ্চারিত হচ্ছে। ইহা দেখে রাজা ভয়ে সন্ত্রস্থ হয় এবং রাজার প্রধান সেনাপতি ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। রাজা তখন স্থানীয় মুসলমানদের ডেকে এনে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর মস্তক সমাহিত করার নির্দেশ দেন।
যে স্থানে এই মস্তক সমাহিত করা হয় সেই স্থান ছের মোকাম নামে আজও পরিচিত। অন্যদিকে শাহজাদপুরে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর দেহ-প্রস্তর কফিনে করে মসজিদের দশরশি দক্ষিণে সমাধি করা হয়। পরে কফিনটি সরিয়ে বর্তমান স্থানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গী হযরত ইউসুফ শাহ্ (রহঃ) এতত্ব অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসাবে অধিষ্ঠিত হন। যা এখন পরগনায়ে ইউসুফ শাহী নামে পরিচিত। এখানে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর মাজার ছাড়াও তাঁর হয়রত খাজানুর (রহঃ) ও তার সঙ্গী ইউসুফ শাহ্ (রহঃ) এবং হযরত মখদুম শাহদৌলা এ ওয়াদ বিখ্যাত ওলী হযরত শাহ্ শামসুদ্দীন তাবরেজী (রহঃ) এর মাজার শরীফ আছে।
এই মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণে কিছুদুরে করতোয়া নদীর অপর পাড়ে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) এর যা সবার কাছে বাদলবাড়ী নামে পরিচিত। কিংবদন্তী অনুসারে আরও কতিপয় সমাধী ও পবিত্র স্থান নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামিনি রহমাতুল্লাহি আলাইহির বাৎসরিক ওরশ শরীফ প্রতিবছর চৈত্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় এবং মহান ওস্তাদজি হযরত শামসুদ্দীন তাবরেজী রাহমাতুল্লাহ আলাইহির ওরস শরীফ ৯ই রজব অনুষ্ঠিত হয়। দেশ এবং বিদেশের লাখো মুসুল্লী ওরস শরীফেঅংশগ্রহণ করেন।