

এম,শাহজাহান : শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তাওয়াকোচা এলাকায় একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হলে বদলে যেতে পারে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী দুই উপজেলার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষকের ভাগ্যের চাকা। কম খরচে সেচের পানি পাওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং সেচ নির্ভর বোরো চাষে কৃষকদের লোকসানও কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের পক্ষ থেকে সোমেশ্বরী নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণের দাবি উঠে স্বাধীনতার পর থেকেই। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই দাবি। ফলে রাবার ড্যামের অভাবে কৃষকদের উচ্চমূল্যে গভীর নলকূপের পানি কিনে বোরো চাষ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, বোরো মৌসুমে এক একর জমিতে সেচ দিতে নলকূপের মালিককে দিতে হয় ৮ হাজার টাকা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক বোরো চাষ করে কাঙ্ক্ষিত লাভ করতে পারছেন না। অথচ সোমেশ্বরী নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হলে, সেখানকার পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা হলে প্রতি একর জমিতে ৩ হাজার টাকার মধ্যে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সোমেশ্বরী নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের মেঘালয়ে। নদীটি মেঘালয় থেকে নেমে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার খাড়ামুড়া ও বালিজুড়ি হয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের তাওয়াকোচা, দুপুরিয়া, ধানশাইল ইউনিয়নের বিলাশপুর ও কান্দুলি, ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের দাড়িয়ারপার, সারিকালীনগর, গজারমারি, লঙ্গেশ্বর ও বগাডুবি হয়ে চতল এলাকায় প্রবাহিত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতার পর সোমেশ্বরী নদীর বালিজুড়ি এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হতো। এতে ভাটি এলাকার কৃষকরা পড়তো সেচ সংকটে। এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসী আরও জানান, ২০০১ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সোমেশ্বরী নদীর আয়নাপুর এলাকায় প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে রাবার ড্যামটি নির্মাণ করায় পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এতে সরকারের প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রকল্পটি টেকসই হয়নি। এরপর আর সেখানে রাবার ড্যাম নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে এলাকায় সেচ সুবিধা বাড়াতে বাণিজ্যিকভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এসব নলকূপের পানি কিনেই কৃষকদের বোরো আবাদ করতে হচ্ছে। উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে জাইকা প্রকল্পের আওতায় সোমেশ্বরী নদীর তাওয়াকোচা এলাকায় একটি রাবার ড্যাম নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনেও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কৃষকরা জানান, তাওয়াকোচায় একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হলে বর্ষা মৌসুমের পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতে নলকূপের ওপর নির্ভরতা কমবে, সেচ খরচ কমবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফরহাদ হোসেন বলেন, নির্ধারিত স্থানে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হলে স্বল্পমূল্যে পরিবেশবান্ধব পানিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে। এতে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।