শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবণ ১৪২৮, রাত ১২:৫৩

চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু ভয়াবহতার আশঙ্কা

করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। মূলত রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। জুন মাসে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ২৭১ জনের, যা চলতি বছরে মোট শনাক্তের ৬৯ শতাংশ। গত বছরের জুন মাসে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ২০ জনের। সে হিসাবে গত বছরের জুন মাসের তুলনায় এবারের জুন মাসে রোগী বেড়েছে সাড়ে ১৩ গুণ। ২০২০ সালে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১ হাজার ৪০৫ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার মধ্যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এদিকে মশক নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতাও জরুরি। সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর ডেঙ্গু মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। তবে জুন থেকে সেপ্টেম্বরÑ এই চার মাস মূল মৌসুম। কয়েক দিনের মধ্যে থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টি এডিস মশার বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলছে। করোনা আর ডেঙ্গুর উপসর্গ কাছাকাছি হওয়ায় জ্বর হলে বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুই সিটির নিষ্ফল অভিযান : মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বছরব্যাপী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কাজ করেছে। নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করেছে। নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছে বাসা-বাড়িতে মশামুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্য। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানাও করেছে তারা। এতো কিছু করেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি মশাবাহিত রোগ। নগরে বেড়েছে মশার উপদ্রব। যে কারণে করোনা মহামারির মধ্যে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার কেবল ঢাকায় ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ জন। এছাড়া বর্তমানে রাজধানীর ৪১টি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৪৯ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০১ জন। ইতিমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদা নাসরিন বাবলি মারা গেছেন। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোনো তথ্য নেই। করোনার এ দুঃসময়ে ডেঙ্গু যেভাবে চোখ রাঙাচ্ছে, তাতে শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কীটতত্ত্ববিদদের গবেষণা বলছে, ঢাকার দুই সিটির প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু মশার ঘনত্বের হার আগের তুলনায় অনেক বেশি।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাসার বলেন, ‘বর্তমানে ডেঙ্গুর যে পরিস্থিতি তা সত্যি আশঙ্কাজনক। জুন মাসে আমাদের জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের সব জায়গায় এডিস মশা আছে। জুন মাসের শুরুতে বলেছিলাম, ডেঙ্গুর ঘনত্ব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তার প্রমাণ আমরা এখন পাচ্ছি। শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বাড়বে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন। কবিরুল বাসার বলেন, এ মুহূর্তে খুব প্রয়োজন নগরবাসী এবং সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ। আমাদের বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমার পরিবেশ থাকলে সেটি যেন আমরা নষ্ট করে দিই। সিটি করপোরেশনের কাজ, যেসব পাবলিক প্লেসে পানি জমে সেসব স্থান নষ্ট করতে হবে। ইতিমধ্যে মশা বড় হয়ে গেছে, তাই উড়ন্ত মশাও মারতে উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গু রোগের এমন ভয়াবহ অবস্থার সময় দুই সিটি করপোরেশনের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নগরবাসী বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে দুই সিটির মশা নিধন কর্মীদের দেখা মেলেনি। অথচ এ সময় সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম থাকার কথা ছিল চোখে পড়ার মতো। আর এ কারণে ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছেন বাসিন্দারা।
জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) গত বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দফায় বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মাধ্যমে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ এবং রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিল সংস্থাটি। এসব অভিযানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার স্থানে এডিস মশার লার্ভার সন্ধান পেয়ে সেগুলো ধ্বংস করেছে। সেই সঙ্গে অভিযানে সচেতনতার পাশাপাশি ছিল জরিমানাও।
এসব অভিযানে মশা নিয়ন্ত্রণ না হলেও জরিমানা করে ডিএনসিসির আয় হয়েছে প্রায় পৌনে ১ কোটি টাকা। কিন্তু লাগাম টানা যায়নি ডেঙ্গু উপদ্রবের। একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)। অবশ্য, ডিএনসিসির মতো ডিএসসিসি বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেনি। নামমাত্র নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যেও ছিল চরম অসন্তোষ। খোদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ৩২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ জন, মার্চে ১৩ জন, এপ্রিলে তিনজন। মে মাসে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৪৩ জনে। জুনে চলতি বছরের সব রেকর্ড ভেঙে ২৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। জুলাইয়ের মাত্র ৮ দিনে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩০ জনে!

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি কি করতে যাচ্ছে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, আজ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করবে ডিএনসিসি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, সাধারণ মানুষকে সেভাবে সচেতন করা সম্ভব হয়নি। করতে পারলে পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ হতো না। এই মশা ডোবা-নালায় হয় না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভর করতে হচ্ছে নগরবাসীর ওপর। বাকি ২০ শতাংশ নির্ভর করছে আমাদের ওপর। আমরা গতবার যেভাবে জরিমানা করেছি এবারও তা শুরু হবে। যদিও জরিমানা আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সচেতন করা।

ডিএনসিসি ১০ দিনব্যাপী বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলেও ডিএসসিসির ব্যাপারে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিএসসিসির ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (ডা.) মো. শরীফ আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের কার্যক্রম চলমান। না হলে এক সপ্তাহে সব মানুষ ডেঙ্গু রোগী হয়ে যেত। এরই মধ্যে মেয়র নির্দেশনাও দিয়েছেন যেন ডেঙ্গু নিধন কার্যক্রমে বাড়ির মালিকদের সম্পৃক্ত করা যায়।

সূত্র : আলোকিত বাংলাদেশ।

Developed by: NEXTZEN LIMITED