শনিবার, ৮ মে ২০২১, ২৫ বৈশাখ ১৪২৮, দুপুর ১:২৬
শিরোনাম :
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুলাদীতে নবাগত উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর মোহাম্মাদ হোসাইনীর যোগদান মুলাদীতে শুভ্রতা ছড়িয়ে বিদায়ের বেলা সকলের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন ইউএনও শুভ্রা দাস মুলাদীতে ইউএনও শুভ্রা দাসকে বিদায়ী সংবর্ধণা মুলাদীতে কর্মহীন দরিদ্রদের মাঝে উপজেলা প্রশাসনের দোকান ও ভ্যান বিতরণ নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে না পারায় ভাতা পাচ্ছেন না অশীতিপর বৃদ্ধা হাচেন ভানু মুলাদীতে থানা পুলিশের উদ্যোগে মাস্ক বিতরণ শিশুদের জীবনকে আলোকিত ও সুন্দর হিসেবে গড়ে তুলুন : প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও কর্ম থেকে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে দশ দিনের কর্মসূচি আজ থেকে শুরু

আলোকপাত: স্বর্ণের দাম কেন এত স্পর্শকাতর? – ড. মইনুল খান

করোনায় বাঁচা-মরার সংকটের মধ্যেও স্বর্ণের খবরের আকর্ষণ খানিকটা উপচে পড়ার মতো। মূল্যবান এ ধাতুর দাম ক্রমে উঠতির দিকে। সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে এর দাম। কোথায় গিয়ে ঠেকবে এই প্রবণতা? কেনই-বা বাড়ছে? সাধারণ ভোক্তারা এখন কী করবেন? এমন আলোচনা এখন অনেককে স্পর্শ করছে। স্বর্ণের প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত বিশেষ দুর্বলতা থেকেই হয়তো এই আকর্ষণ। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিমানবন্দরগুলোয় কোটি কোটি টাকার অবৈধ পণ্য আটক হলে যে কাভারেজ দেখা যায়, তার চেয়ে কম মূল্যের স্বর্ণ আটকের খবর দ্রুত ও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার পায়। স্বর্ণের দাম বাড়ার আলোচনা হয়তো এই আগ্রহ থেকেই সৃষ্ট। তবে সার্বিক অর্থে স্বর্ণের হিসাবনিকাশ কেবল চোখ জুড়ানো গহনার মধ্যেই সীমিত নয়, তা বর্তমান বৈশ্বিক সংকটেও দেখিয়ে দিচ্ছে।

নাম করা অনলাইন গোল্ড ট্রেডিং সাইট কিটকোর তথ্যানুযায়ী, ২৪ জুলাই স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স (প্রায় ২.৬৭ ভরি বা ৩১.১০৩ গ্রাম) ১ হাজার ৯০১ ডলারে পৌঁছে। এটি স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ রেকর্ড। বর্তমানের এই বৃদ্ধি নয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০১৯ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ছিল ১ হাজার ৪৫৪ ডলার। প্রায় সাত মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা অনেককে বিস্মিত করেছে। করোনার মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর মূল্য বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৬০ ডলার। মার্চে অবশ্য দাম পড়ে যায় এবং তা ১ হাজার ৪৬৯ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাস থেকে আবার দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। এর পর থেকে দাম বেড়েই চলেছে। মূল্যবান ধাতবের বাজার বিশ্লেষক আনা গোলুবোভার (২০২০) মতে, এই দাম হয়তো অচিরেই ২০১১ সালের ১ হাজার ৯২০ ডলারের রেকর্ড অতিক্রম করবে এবং তা ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছে দুই দফায়। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস) প্রথম দফায় ২৩ জুন থেকে এর নতুন দাম নির্ধারণ করেছে। সমিতির তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ধরা হয়েছিল ৬৯ হাজার ৮৬৭ টাকা। ২১ ক্যারেটের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬৬ হাজার ৭১৮ ও ১৮ ক্যারেটের দাম ৫৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে সনাতন স্বর্ণের দাম করা হয় ৪৭ হাজার ৬৪৭ টাকা। আগের তালিকা অনুসারে, প্রথমবার প্রতি ভরিতে ৫ হাজার টাকার বেশি মূল্য বাড়িয়ে ধরা হয়। আগে এই বৃদ্ধি ১ থেকে ৩ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার ২৪ জুলাই থেকে আবার স্বর্ণের পুনর্র্নিধারিত দাম কার্যকর হয়েছে। বাজুসের নতুন তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ৭৮৩ টাকা, ২১ ক্যারেটের স্বর্ণ ৬৯ হাজার ৬৩৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ ৬০ হাজার ৮৮৬ ও সনাতনী স্বর্ণ ৫০ হাজার ৫৬৩ টাকা। প্রথম ধাপের তুলনায় দ্বিতীয় দফায় দাম বেড়েছে গড়ে প্রতি ভরিতে প্রায় ২ হাজার ৯১৬ টাকা।

স্বর্ণের ভোক্তাদের অনেকে এই দাম বাড়ার যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশে যেহেতু বৈধ স্বর্ণের আমদানি নেই, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও এখানে দাম বাড়াতে হবে কেন? স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আগে বলতেন, তাদের ব্যবসার অধিকাংশই দেশীয় স্বর্ণ দ্বারা পূরণ হয়। তাহলে এখন কেন তাদের দাম ঊর্ধ্বমুখী হবে? কিন্তু স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের স্বর্ণের অধিকাংশই আমদানীকৃত না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় না করলে কেবল দামের তারতম্যের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশে তা পাচার হয়ে যেতে পারে। স্বর্ণ যেহেতু ‘গ্লোবাল কারেন্সি’, তাই বিশ্বের সব জায়গায় এই মূল্যবান ধাতুর দামও এক হবে। এ ব্যাখ্যায় কোনো কোনো ব্যবসায়ীর হাতে থাকা মজুদ স্বর্ণের ওপর অপ্রত্যাশিত বাড়তি লাভের বিষয়টি চাপা থাকছে। অবশ্য পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাবে এই বাড়তি লাভের যোগটি তাদের কাছে এখনই তেমন ধরা দিচ্ছে না।

বর্তমান করোনায় ক্রেতাদের চাহিদায় ভাটা পড়াটাই স্বাভাবিক। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বর্ণের দোকানে আগের মতো বেচাকেনা দেখা যায় না। এ সংকটে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে বিশ্বব্যাপী এই চাহিদা কমতির দিকে। তাহলে চাহিদা হ্রাসের কারণে অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী এর দামে প্রভাব ফেলছে না কেন? স্বর্ণের অর্থনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর দামের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু নিয়ামক কাজ করে। এটি অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ন্যায় বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবণতার প্রতি একইভাবে সংবেদনশীল নয়। স্বর্ণের অর্থনীতি বুঝতে হলে এই নিয়ামকগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। স্বর্ণ কেবল জুয়েলারি খাতে ব্যবহূত হয় তা নয়। জুয়েলারির বাইরে এই মূল্যবান ধাতুর ব্যবহার রয়েছে। জুয়েলারিতে স্বর্ণের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হলেও অন্যান্য খাতেও এর চাহিদা উল্লেখযোগ্য। যেমন ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের চাহিদা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৫৬ টন। এর মধ্যে ৫২ দশমিক ৪৪ শতাংশ জুয়েলারিতে ব্যবহার হয়, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১৩৫ টন। অন্যান্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে বার ও কয়েন ২৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগ্রহ ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ইলেকট্রনিকস ৯ দশমিক ১২ শতাংশ, অন্যান্য শিল্প ৬ দশমিক ৫২ ও দন্ত চিকিৎসা ১ দশমিক ২৪ শতাংশ, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) দশমিক ৪১ শতাংশ। এই তথ্য নির্দেশ করে যে বর্তমান করোনাকালীন জুয়েলারির মতো ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার সীমিত হলেও অন্যান্য খাতে চাহিদা ও সরবরাহের চাপ স্পষ্ট। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, গত তিন দশকে স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ২৩৫ শতাংশ, যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বর্ণের দামে ওঠানামা অন্যান্য পণ্যমূল্যের মতো নয়। জ্বালানি তেল, ইথানল, তুলা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতব পণ্যের নিজস্ব ভোগ রয়েছে। কিন্তু স্বর্ণের এ-জাতীয় ভোগ নেই। অর্থাৎ এর ব্যবহারে ক্ষয় বা শেষ নেই। যেটুকু শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, তা মোট স্বর্ণ ব্যবহারের ১০ শতাংশ। এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, স্বর্ণের বিনিয়োগে তেমন কোনো আয় সৃষ্টি করে না। অন্যান্য বিনিয়োগে (যেমন স্টক, ডিপোজিট, রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি) রিটার্নের সংযোগ থাকলেও স্বর্ণের দ্বারা এমনটি হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বর্ণের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা অনেক বেশি। এর মূল কারণ হলো এর স্থায়িত্ব, সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও দ্রুত নগদে পরিণত করার সুযোগ।

আগেই বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের দাম নির্ধারণে নিজস্ব অর্থনীতি কাজ করে। অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের চরিত্রের ন্যায় স্বর্ণের বাজার সর্বোতভাবে প্রভাবিত হয় না। ব্যাংকবাজার.কম অনুযায়ী, স্বর্ণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে কমপক্ষে ১১টি নিয়ামক স্বর্ণের বাজার নির্ধারণ করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সরকারি বা আর্থিক বাজার সম্পর্কে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটে স্বর্ণকে ‘নিরাপদ স্বর্গ’ মনে করা, মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে স্বর্ণকে সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা, দুর্বল ডলারের কারণে স্বর্ণের প্রতি ঝোঁক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক রিজার্ভ সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য স্বর্ণ ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো, সুদহার পড়ে যাওয়ায় স্বর্ণ ধরে রাখার ন্যূনতম বিনিময় খরচ ইত্যাদি। এসব কারণ বিশ্লেষণ করলে বর্তমানে স্বর্ণের দামের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান চরিত্র পাওয়া যায়। প্রথমত, বিশ্বব্যাপী বা আঞ্চলিক কোনো ঘটনায় আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ভোক্তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকে পড়েন। চলমান চীন-ভারত সীমান্ত দ্বন্দ্ব ও মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কোনো কোনো সময়ে তাদের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের প্রচ্ছন্ন হুমকি বিশ্ববাজারে দামের বেলায় অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। দ্বিতীয়ত, করোনার সংকট প্রতিটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিপর্যস্ত করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এসেছে স্লথগতি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, যা বর্তমানে স্বর্ণের বাজারে অস্বাভাবিকতার জন্য অনেকাংশে দায়ী। দ্বিতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এবং অন্যদিকে বিশেষ করে স্টক মার্কেট ও রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগে আস্থার অভাবে স্বর্ণকে অতি নিরাপদ পণ্য বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী কর্তৃক স্বর্ণ ক্রয়ও বেড়ে গেছে। ফলে চাহিদা বাড়ায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং এর আবশ্যিক পরিণতি হিসেবে দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বুলিয়নভল্টের বিশ্লেষক এড্রিয়ান অ্যাশ (২০২০) এ অবস্থাকে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে—‘এড়ষফ ড়হষু ষড়াবং নধফ হবংি.’ বর্তমানের স্বর্ণের চড়া দাম বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক, এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশে স্বর্ণের মূল্যটা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গেই সম্পর্কিত। স্বর্ণ ‘গ্লোবাল কারেন্সি’ হিসেবে এই বাজারমূল্যে সংবেদনশীলতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে চলতি সংকটে স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ক্রেতাসাধারণের ক্রয়ক্ষমতাকে গভীরভাবে সংকুচিত করছে। বলতে গেলে, স্বর্ণ এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের হাতের নাগালের বাইরে। দেশের বাজারে তেমন কেনাকাটা লক্ষণীয় নয়। বাজুস বলছে, এই করোনা সংকটে অভ্যন্তরীণ বাজারে খুচরা বিক্রি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বরং যারা আগে কিনেছেন, আর্থিক দুর্দশায় তারা অনেকে এসে স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে তারা দামও পাচ্ছেন; সংকটে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমর্থনও হচ্ছে। রাজধানীর একটি খ্যাতনামা শপিংমলের মাঝারি মানের স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জুনে (২০২০) তার দোকানে মোট ৬ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি হয়েছে, আগে যা প্রায় ৩০ লাখ টাকা ছিল। অথচ আর্থিক কারণে অনেক ক্রেতা আগে ক্রয় করা স্বর্ণালঙ্কার তার কাছে বিক্রি করেছে ১০ লাখ টাকার। অর্থাৎ তার দোকানের বিক্রির চেয়ে ক্রেতাদের কাছে থেকে ফেরতের পরিমাণ বেশি। বর্তমানে করোনার কারণে শেষ সম্বল হিসেবে আগে ক্রয়কৃত এই সম্পদ বিক্রি করে কেউ কেউ টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। বাজুসের একজন নেতৃস্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী এ তথ্যকে এখন সাধারণ চিত্র বলে বর্ণনা করেন।

স্বর্ণের এই দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় সচ্ছল ক্রেতারা এখন কী করবেন? তারা কি স্বর্ণ কিনে রাখবেন? এর সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে স্বাভাবিক বিশ্লেষণ বলছে, যেকোনো ক্রেতার স্বর্ণ ক্রয়ের বিবেচনাটা দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু স্বল্পমেয়াদেও স্বর্ণের দামে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। এক সপ্তাহ, মাস ও বছরের ব্যবধানে এর ওঠানামা চোখে পড়ার মতো। ২০১২ সাল থেকে গত আট বছরে স্বর্ণের দামে এই তারতম্য হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। বর্তমান সময়েই সবচেয়ে বেশি দাম উঠেছে। কেউ বলছেন, এর দাম আরো বাড়বে। কিন্তু গত ২০ বছরের প্রবণতা অনুযায়ী দেখা যায়, স্বর্ণের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি দাম পড়েও গেছে। বর্তমানের বাজারটা অনেকটাই করোনাকেন্দ্রিক হওয়ায় এই অস্বাভাবিকতার রূপটি দীর্ঘ না-ও হতে পারে। যেকোনো সময়ে করোনার ভ্যাকসিন বাজারজাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব স্বাভাবিক গতিতে ফিরে যাবে। তখন এই দামে আবার পতন হতে পারে। এই অনিশ্চয়তার পরিস্থিতিতে তাই স্বর্ণ কেনাটা যৌক্তিক কিনা, তা অনেকেই অনুমান করতে পারেন।

বর্তমান সময়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, স্বর্ণের নিজস্ব কোনো ডিভিডেন্ড বা রিটার্ন নেই। অন্যান্য বিনিয়োগ যেমন রিটার্ন আনছে, স্বর্ণ সেখানে অলস পড়ে থাকছে—কোনো ধরনের নিয়মিত আয় ব্যতিরেকে। মার্কিন ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট (২০১৩, মার্কেটওয়াচ) তাই এ ধরনের স্বর্ণে বিনিয়োগকে সর্বদাই নিরুৎসাহিত করেছেন। তার মতে, ব্যাংকে টাকা রাখলে সর্বনিম্ন হলেও সুদহারে আয় আসে। কিন্তু স্বর্ণে তা অনুপস্থিত। স্বর্ণ ক্রয়ের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো এর নিরাপত্তা সম্পর্কিত। এই মূল্যবান ধাতু সংরক্ষণের ঝুঁকি এড়াতে ক্রেতাদের লকার ভাড়া বা অন্য নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা বা সেবা ক্রয় বাবদ খরচ করতে হয়। এতে তাদের বাড়তি টাকা ব্যয় হওয়ায় এর রিটার্ন আরো কমে যেতে পারে। চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারীর ভয় তো সবসময় আছে। সংকটকালীন এ ভয়টা আরো বেশি।

তাহলে এখন কি কেউ স্বর্ণ কিনবেন না? যাদের স্বর্ণ কেনা অত্যাবশ্যকীয়, তারা কী করবেন? দীর্ঘদিন স্বর্ণের ব্যবসা করছেন এমন একজন বললেন, বিয়েশাদি বা অনুষ্ঠানাদির জন্য এখনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এর সংখ্যা খুবই কম। এসব ক্রেতা প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় কমই কিনছেন। আগে যেখানে একজন দশ ভরি কিনতেন, চড়া দামের কারণে এখন তিনি পাঁচ ভরি কিনছেন। যেসব সামর্থ্যবান ক্রেতা শখের বশবর্তী হয়ে কিনতেন, তাদেরও এখন খুব কম দেখা যায়। বিনিয়োগের জন্যও এখন কাউকে আগ্রহী হতে দেখা যায় না। তিনি বললেন, এখন স্বর্ণ ক্রয়ের সময় না। এর দাম এখন সবচেয়ে বেশি। তবে এটি মোটেই স্বাভাবিক নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে এই দাম আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতে এমন প্রবণতার নজির রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান স্বর্ণের বাজারে দাম বাড়ার পেছনে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ‘গেম’ থাকতে পারে, যা হয়তো প্রকৃত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে না। যেকোনো সময়ে বাজার ‘সংশোধন’ হলে স্বর্ণের দামেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

বর্তমানের স্বর্ণের চড়া দাম অনেকটা করোনায় থমকে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে উৎসারিত। আর যেকোনো সময়ে বিশেষ করে আবিষ্কৃত টিকা বাজারজাত শুরু হয়ে গেলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। এতে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে চলমান অস্থিরতা কেটে গেলে দেশেও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে—এমনটা আশা করা যায়। তাছাড়া সরকার কর্তৃক স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন (২০১৮ সালে প্রণীত) ও তা বাস্তবায়নের সুফলও হাতছানি দিচ্ছে। এরই মধ্যে এ নীতিমালার আওতায় বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি শুরু হয়েছে। সরকার চলতি বাজেটে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট মওকুফ করে দিয়েছে। সাধারণ স্বর্ণকাররা বৈধভাবে এই হ্রাসকৃত কর দিয়ে স্বর্ণ কিনে অলঙ্কার তৈরিপূর্বক তা বাজারে সরবরাহ করতে পারবেন। অন্যদিকে আগের বাজেটে (২০১৮-১৯) ব্যাগেজ রুলের আওতায় প্রতি ভরিতে শুল্ক ৩ হাজার টাকার পরিবর্তে ২ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়। শুল্ক-ভ্যাট হ্রাসের এ সুবিধা ক্রেতাসাধারণও পাবে। পরিশেষে, একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর মন্তব্যকে উপজীব্য করে বলা যায়, করোনা থেকে উত্তরণের জন্য এখন অপেক্ষা করাই হবে যৌক্তিক আচরণ।

লেখক : ড. মইনুল খান, মহাপরিচালক, ভ্যাট গোয়েন্দা, তদন্ত ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর;
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

Developed by: NEXTZEN LIMITED